শাইখ সিরাজের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ এবং পূর্বধলায় আরবানের ‘তথ্যকল্যাণী’

11780_x1-400x247মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : আমার এক বন্ধুর ছোট ভাই, সৈয়দ আরিফুজ্জামান মাসুম বেশ কয়েক বছর আগে নিজ গ্রাম নেত্রকোণার পূর্বধলায় ‘অ্যাকটিভিটি ফর রিফরমেশন অব বেসিক নিডস’ অর্থাৎ মৌলিক চাহিদার জন্য উজ্জ্বীবন তৎপরতা বা সংক্ষেপে ‘আরবান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। নেপথ্যে প্রেরণা আমার বন্ধু সৈয়দ আশরাফুজ্জামান শাহীন। গৌরবের বিষয় যে, প্রতিষ্ঠানটি ‘আইসিটি’ বা তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ এশিয়ার আন্তর্জাতিক মানদন্ডে ‘সেরা’ খ্যাতিটি অর্জন করেছে। সেই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও মাইক্রোসফ্ট আয়োজিত যুব উদ্ভাবণ প্রতিযোগিতায় ফাইনালিষ্ট হয়। তার আগে ২০১১ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি পর্যায়ে ‘মান্থান অ্যাওয়ার্ড’ এবং একই বছর বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ‘ই-লাইভলিহুড‘ বা ইলেকট্রনিক জীবনযাত্রা সঞ্চারে ‘জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবণ অ্যাওয়ার্ড’ পায়। এসব জেনে তিন দশকের কৃষি উন্নয়নের অগ্রদূত, কৃষকের প্রাণের বন্ধু এবং বেসরকারী টিভি ‘চ্যানেল-আই’র হেড অব নিউজ, শাইখ সিরাজ তার ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের কলা-কুশলীদের নিয়ে চলে যান পূর্বধলায়, যা ইউটিউবে ‘ইনফো-লেডিজ ব্রিরিং ইনফো-সার্ভিস রেভোলুশন’ নামে রয়েছে।
শুধু তাই নয়, তিনি এতোটাই মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন যে, নিজেই দেশের শীর্ষ ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি ষ্টারে কার্যক্রমটির উপর ‘ইনফো-লেডি: দ্য পেডলার অব ইনফরমেশন’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেন, যা পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে রয়েছে। এতে তিনি শেষটায় অভিমত ব্যক্ত করে লিখেছেন- ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে যারা যেতে পারেন না, তাদের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে সরকারিভাবে একই প্রযুক্তির তথ্যাদি দিয়ে প্রশিক্ষিত করে অনুরূপ কার্যক্রমটি পরিচালনা করা যেতে পারে। এছাড়াও বেসরকারিভাবে যারা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে সেবা প্রদান করেন, তারাও আরবানের ‘তথ্যকল্যাণী’র দৃষ্টান্তটি স্থাপনে এগিয়ে আসতে পারেন।
এ পর্যন্ত বিবৃত আরবানের উপর ওই দুটি প্রামাণ্য দলিল সারা বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে মাত্র একটি ক্লিকের অপেক্ষা; চাইলেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরখ করে দেখা যেতে পারে।
আমি বিমুগ্ধ, শাইখ সিরাজের মতো গুণী মানুষটি আগ্রহভরে ‘আরবান’-কে কেবল বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে তুলে ধরেননি, বরং ইংরেজি পত্রিকা পাঠকসহ উপস্থাপিত অনুষ্ঠানটির ভিডিওতে ইংরেজি সাব-টাইটেল দিয়ে সেটাও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জ্ঞানসঞ্চারী করেছেন। আর হবে না কেন? এ বছরের মাঝামাঝি ডেইলি ষ্টারে প্রকাশিত তার স্বগতোক্তিটি হচ্ছে- ‘নো কালচার উইথআউট এগ্রিকালচার’ অর্থাৎ কোনো সংস্কৃতিই কৃষিবর্হিভূত নয়। সে জন্য হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’, ‘কৃষকের বৈশাখী আনন্দ’, ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ এবং ‘ফিরে চলো মাটির টানে’র মতো অনুষ্ঠানগুলো পরম সযতেœ জীবনমুখী ও একান্নবর্তী হয়েছে। ওই সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ‘কৃষক আমাদের অর্থনীতির মেরুদন্ড। আমার সব স্বপ্নই তাদের ঘিরে। কৃষকের হাসিমুখ না দেখলে আমার ঈদ হয় না’। তার কথা, ‘চারা রোপন থেকে ঘরে ফসল তোলার প্রক্রিয়াটি একজন কৃষকের অনিশ্চিত যাত্রা, তাতে ২৩টি ধাপের ১৭টিই পরিপূর্ণ করেন এককভাবে নারী’। তাই বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কৃষক এমনকি শহরের মানুষের কিচেনগার্ডেনও তার অনুষ্ঠানের উপজীব্য হয়েছে। সম্প্রতি দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে সবিশেষ ভূমিকা রাখায় তাকে ফিলিপাইনের গুসি শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তার আগে পেয়েছেন একুশে পদক ও জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার এএইচ বোয়েরমা অ্যাওয়ার্ড।
তেমনি পূর্বধলার ‘আরবান’ প্রতিষ্ঠানটিও তার মতো কৃষকের আনন্দে হয়েছে নিবেদিতপ্রাণ। প্রতিষ্ঠানটির দশজন নারীকর্মী নিজেদের পড়াশোনার পাশপাশি অবকাশে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে কৃষকের জন্য ‘তথ্যকল্যাণী’ হয়েছেন। সাইকেলে করে তারা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে তথ্য ফেরি করে বেড়ান। মাধ্যম একটি ‘ল্যাপটপ’, তাতেই থাকে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্ভাবণে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ধরনের মৌলিক চাহিদার শিক্ষামূলক তথ্যচিত্র। চারাগাছে পোকা ধরা থেকে শষ্য বা ফল কখন কী প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বাজারজাত করা যায়, কী ধরণের কীটনাশক প্রয়োজন কিংবা শিশু ও মায়েদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কী, কেন তা প্রয়োজন এবং কী ধরনের শষ্য সবজি ফলে গুণগত ও মানসম্মত উপাদান রয়েছে, তা এই তথ্যকল্যাণীরা হাসিমুখে জানিয়ে দিচ্ছেন। আর আগ্রহদীপ্ত কৃষিপরিবারগুলো যথাসময়ে কীটপতঙ্গ থেকে সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত চাষাবাদ ও বাজারজাতকরণ এমনকি স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রায় সচেষ্ট হচ্ছেন। এভাবেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ছে তথ্যকল্যাণীর সহায়তায় এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি এবং এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম। এ কার্যক্রম প্রসঙ্গে আরবানের নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্যটিও সুষ্পষ্ট- এতে কৃষি পরিবারগুলো প্রাচীন ধ্যান-ধারণা ছেড়ে আধুনিক চাষাবাদে মনোযোগী, এমনকি জৈব সার ব্যবহারেও সচেতন হতে পারছেন। ফলে সমৃদ্ধির বাতায়নটি তাদের হাতের নাগালে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়েছে। এছাড়াও অচিরেই গ্রামীণ শিশু-কিশোরদের মনন বিকাশে সংযোজিত হচ্ছে একটি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিভাগ।
বাস্তবিকই এ যেন সেই দেশপ্রেমিক মানুষের উপাখ্যান, যে কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হয়েছে। তাই হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় উপস্থাপক শাইখ সিরাজ এবং আরবানের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আরিফুজ্জামান মাসুমকে জানাই অশেষ শুভকামনা ও অভিনন্দন!
ই-মেইল: নঁশযধৎর.ঃড়ৎড়হঃড়@মসধরষ.পড়স