দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিপিও সম্মেলন

Billboard_Final_Press-2-04-300x300মনজুর-এ আজিজ / রিকু আমির : ব্যবসায় পরিচালনা, উন্নয়ন ও বিনিয়োগে বিশ্বের আদর্শ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ব্রান্ডিংয়ে আগামী বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সম্মেলন।

রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁও- এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয় এ আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রী ও ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন সোসাইটি অ্যান্ড সার্ভিস অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান আ হ ম ম‍ুস্তাফা কামালসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা এতে অংশ নেবেন।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজক।

আয়োজকরা জানান, ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টিওয়ান বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন যে বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেট ও ব্যক্তি মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা, গ্রাহকসেবা এবং ব্যবসায়িক স্থাপনার জন্য প্রস্তুত-তারই দৃশ্যায়ন হবে এই সম্মেলনে। পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বর্ণস্তম্ভে বিপিওকে পরিচিত করা, তরুণদের আগ্রহী করা ও উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক পরিচিতির সুযোগ দেয়াও আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য।

সম্মেলনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতনামা ৪০ জনেরও বেশি বক্তাগণ বিভিন্ন সেশনে স্পিকার থাকবেন। স্পিকারদের মধ্যে রয়েছেনÑ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকউন্টস এর সিইও ফায়েজুল চৌধুরী, এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট আবদুল মাতলুব আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ান বিপিও অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্টিন এন কনবয়, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং এশিয়ান-ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশনের (অ্যাসোসিও) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ এইচ কাফী, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের পলিসি অ্যাডভাইজার আনীর চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ইনফোসিস এর এমডি ও সিইও ড. বিশাল সিক্কা, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার, বেসিস সভাপতি শামীম আহসান, মাইক্রোসফটের এমডি এবং টাই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সোনিয়া বশির কবির, আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ও টেকনোলজি ব্যবসায় বিশেষজ্ঞ স্যানটিয়াগো গুটায়ারেজ, ডাটাবেইজ মার্কেটিং এবং কাস্টমার রিলেশন ম্যানেজমেন্ট সলিউশন বিশেষজ্ঞ রাজমোহন ভি, বিনোদ হ্যামপাপুর র‌্যাঙ্গাদোর, শ্রী দয়া খালসা, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ কলসেন্টার এন্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) সভাপতি আহমেদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ হোসেন এছাড়া তথ্যপ্রযু্ক্িত ব্যবসায় সেক্টরের অনেক বিশেষজ্ঞগণও এই সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন।

সম্মেলনে বিভিন্ন সেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্টার্ট আপস, বাংলাদেশ ইয়ুথ টু ড্রাইভ বিপিও ইন্ডাস্ট্রি, অপরচুনেটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ইন ব্যাংকিং আউটসোর্সিং, কানেক্টিং দ্যা আনট্যাপড স্কিল : পলিটেকটিক, ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল, ইনফ্রস্ট্রাকচারাল অ্যান্ড অপারেশনাল রেডিনেস, ফিউচার চ্যালেঞ্জেস অব বিপিও ট্রান্সফরমেশন, ইনোভেশন ইকোসিস্টেম-অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ইনকিউবিটরস, রোল অব হায়ার এডুকেশন ইন্সিটিউশনস ফর বিপিও ইন্ডাস্ট্রি, এন্টারপ্রেইনারশিপ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, দ্যা অপরচুনেটিজ অব আউটসোর্সি ক্লায়েন্ট সার্ভিসেস ফ্রম আইটি পার্সপেক্টিভ, গ্লোবাল বিপিও ইন্ডাস্ট্রি বেস্ট প্রাক্টিসেস, দ্যা অপরচুনেটিজ ইন দ্যা ডোমেস্টিক মার্কেট ফর দ্যা বিপিও। এসব সেশন ছাড়াও সম্মেলনে বিপিও সেক্টরের বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকছে।

এই সম্মেলন উপলক্ষে ২০০ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন বিপিও সেন্টারে চাকরির নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। এজন্য দেশের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় সাত হাজারের মতো সিভি সংগ্রহ করছে আয়োজকরা। সম্মেলন উপলক্ষে দেশের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাক্টিভেশন কার্যক্রম চালাচ্ছে বাক্য। এসব অ্যাক্টিভেশন ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার ক্লাব থেকে তরুণদের বিপিও সেক্টর সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ঠিক উপযুক্ত সময়েই এই বিপিও সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে, যখন সরকার ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৮ হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে দেশের ১ হাজার ২০০ ইউনিয়নকে দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনার কাজ শুরু করেছে।

জানা গেছে, দেশের ৭টি বিভাগের ৬৪টি জেলার ৬৪টি উপজেলা, ৩১৯টি পৌরসভা এবং ১০০টি কলেজে স্থাপন করা হচ্ছে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) সেন্টার। সরকারের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক বিপিও মানচিত্রে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার আলোই দেখায়। ধারণা করা হয়, এখন বিশ্বে বিপিওর বাজার আছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৮০ শতাংশ মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান তাদের অফশোর কেন্দ্রগুলোকে আরও সম্প্রসারিত করছে এবং করবে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নীতিমালায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে কার্যক্রম সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ রাখছে। এই রি-শোরিংয়ে পাশের দেশ ভারত বিপিওতে জড়িত বেশ অনেক দিন ধরেই। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সেই তিন-চার বছর আগে থেকেই বছর প্রতি রপ্তানি আয়ে যুক্ত করে যাচ্ছে আট থেকে দশ হাজার কোটি ডলার। প্রতি বছর দেড় থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান করছে এই খাতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এখন এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে ব্যবসা। যেমন: যে পণ্যের উৎপাদন হতো যুক্তরাষ্ট্রে, এখন তা হচ্ছে চীনে। ইলেক্ট্রনিকসের বেলায় যেটা হতো জাপানে, সেটা চলে গেছে কোরিয়ায়। তৈরি পোশাকশিল্প ছিল চীন ও ভারতে, আর সেটাই এখন বাংলাদেশ করে দিচ্ছে আস্থার সঙ্গে। একই অবস্থা বিপিও’র ক্ষেত্রে। দেশে কল সেন্টার ও বিপিও সেবার মাধ্যমে হাজার কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কল সেন্টার ও বিপিও প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত গ্রাহক তথা অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের তথ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তুলনামূলক কমমূল্যে পাওয়ার জন্য উন্নয়নশীল দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ সেবা নেয়। এ খাতে সেবাদানকারী শীর্ষ দেশ ভারত, ফিলিপাইন ও চীন। গত কয়েক বছরে ভারত ও ফিলিপাইনে এ সেবার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। চীনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই এ সেবার বড় বাজার তৈরি হয়েছে। ফলে এসব দেশ থেকে সেবা নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাধ্য হয়েই বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের কথা ভাবছে। আর ‘বিপিও সামিট-২০১৫’ ডিজিটাল বাংলাদেশের সকল সাজসজ্জা নিয়েই এবার বিশ্বকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

দেশের প্রথম এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), সিটিও ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ওমেন ইন টেকনোলজি (বিডব্লিউআইটি) ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)।

সূত্রে জানা যায়, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) এর বিশ্ববাজারের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের হলেও সেখানে এখনো বাংলাদেশের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য নয়। তবে, আশার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে এই সেক্টরের বিকাশ হচ্ছে। বিশেষ করে, টেরিস্ট্রোরিয়াল ইন্টারনেট ক্যাবল সংযোগ, থ্রিজি সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির কারণে দেশে এবং বিদেশে আউটসোর্সিং কাজে দেশের অংশগ্রহণ বাড়ছে। আউটসোর্সিং বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ২০২১ সালে এই খাত থেকে আয় হবে ১ বিলিয়িন ডলার। একই সময়ে এই খাতে কর্মসংস্থান হবে অন্তত ২ লাখ মানুষের।