পাশে নেই মমতাজ, তাই

20130703-momtaz-300x180আবুল বাশার নূরু : মানিকগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী রমজান আলী পরাজিত হয়েছেন। এর আগে টানা ৩৪ বছর মেয়র হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার নির্বাচনে সাবেক স্ত্রী ও খ্যাতিমান গায়িকা ও সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম রমজানের পাশে ছিলেন না।
১৯৭৬ সালের ৫ মে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে দরিদ্র বাউল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজ বেগম । বাবা বিখ্যাত বাউল শিল্পী মধু বয়াতী। মা উজালা বেগম। দাদা মরহুম আলম বেপারী ছিলেন বৈঠকী গানের শিল্পী। তার বাবার দুই পরিবার ছিল। বড় মায়ের ঘরে এক ভাই ও তিন বোন। আর পরের মায়ের ঘরে মমতাজ এবং আরও দুই ভাই রয়েছেন।
মমতাজের প্রথম স্বামী ছিল বাউল শিল্পী রশিদ বয়াতি। এরপর মানিকগঞ্জ পৌরসভা চেয়ারম্যান মো. রমজান আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মমতাজ তৃতীয় বিয়ে করেন মঈন হাসান চঞ্চলকে যিনি তারই হাসপাতালের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক।
দ্বিতীয় স্বামী রমজান আলীর অনেক গঞ্জনা সইতে হয়েছে মমতাজ বেগমকে। বলা চলে মমতাজ বেগমের সাহচর্য, বুদ্ধি ও মেধাই শুধু নয়, গায়িকা হিসেবে যে অর্থবিত্তের মালিক হয়ে ওঠেন মমতাজ বেগম তার একটা বিরাট অংশ ব্যয় করেন সাবেক স্বামী রমজান আলীর পেছনে। সেই হিসেবে রমজান আলীর রাজনীতির জন্যে অকাতরে পয়সা ঢেলেছেন মমতাজ বেগম। কিন্তু বিনিময়ে কোনো প্রতিদান পাননি। তার এই দু:খ দুর্দশা জানতেন মমতাজের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের চিকিৎসক মঈন হাসান চঞ্চল। সমব্যথী থেকে পরিণয়।
এরপর রমজান আলী চেয়ারম্যান ও মমতাজের পথ দুটি দিকে বেঁকে গেছে। পদ্মার জল অনেক গড়িয়েছে। ততদিনে মমতাজ বেগম ২০০৮ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে রমজান আলীর ভোট কমেছে। সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে দেখা যায় স্বতন্ত্র প্রার্থী গাজী কামরুল হুদা ১৩৪৪৯ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির নাসিরউদ্দিন আহমেদ পেয়েছেন ১২২০৮ ভোট। আর নৌকা প্রতীক নিয়ে রমজান আলী পেয়েছেন ৯৯১৬ ভোট।
একদিন মমতাজ বেগমের শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে চরম অভাব আর দৈন্যতায়। বাবা মধু বয়াতির ছিল ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। ঘরহীন, সংসারহীন বাউল বাবার হাত ধরেই তার গানের ভুবনে পথ চলা। গানকে সঙ্গী করেই জীবনের সমস্ত ক্ষুধা নিবারণের এক জীবন্ত উদাহরণ কিংবদন্তি মমতাজ। কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতাই দমিয়ে রাখতে পারেনি গানপাগল মমতাজের স্বপ্নকে। গান দিয়েই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তিনি। হাজারো দুঃখের মাঝে গান গেয়েই আনন্দ খুঁজে পান। গানেই প্রেম-ভালোবাস, গানেই বিরহ অনুভূত করে চলছেন। ফলে সংসার জীবনের অস্থিরতা থাকলেও তা সঙ্গীত জীবনের কোনো ছন্দপতন ঘটাতে পারেনি। বরং নিজের সুর আর ব্যক্তি স্বাতন্ত্রতায় দেশে ও বিদেশে মানুষের অতি কাছের মমতাজ। পালাগানে শুরু হলেও বিচ্ছেদ আর মুর্শিদী গানে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। অসাধারণ এই প্রতিভা সঙ্গীত জীবনের বিশালতায় ঠাঁই দিয়েছেন রাজনীতি আর সামাজিক কর্মকা-কেও। ধলেশ্বরী পাড়ের সেই পালাগান শিল্পী মমতাজ আজ সংসদ সদস্যও।
ভিন্ন ধারার গান পরিবেশনের কারণে মিউজিক কুইন বা সুর সম্রাজ্ঞী নামেও তিনি বহুল পরিচিত। দুই দশকের বেশি তার পেশাদারী সংগীত জীবনে ৭০০টির বেশি একক অ্যালবাম প্রকাশ পায়। প্রথম জীবনে বাবা মধু বয়াতি, পরে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান এবং শেষে আব্দুর রশীদ সরকারের কাছে গান শেখেন।
মানিকগঞ্জ সদরের ‘মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল’-এর আবাসিক চিকিৎসক মো. মঈন হাসান চঞ্চল। চঞ্চলের বাবা ডা. মোসত্মাফিজুর রহমান ও মা ডা. জাহানারা বেগম যশোর শহরের লালদিঘীর পাড়ের সালেহা ক্লিনিকের মালিক। চঞ্চলের বাবা-মার সম্মতিতেই মমতাজ বেগমের সঙ্গে তা বিয়ে হয়েছে। আগের স্বামী মানিকগঞ্জের পৌর মেয়র রমজান আলীর সঙ্গে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিচ্ছেদ ঘটে। মমতাজের প্রথম স্বামী ছিল বাউল শিল্পী রশিদ বয়াতি। এরপর মানিকগঞ্জ পৌরসভা চেয়ারম্যান মো. রমজান আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মমতাজের তৃতীয় বিয়ে হলেও চঞ্চলের এটি দ্বিতীয় বিয়ে।
চঞ্চলের বাবা ডা. মোসত্মাফিজুর রহমান মিডিয়াকে বলেছিলেন, ওরা একে অন্যকে পছন্দ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। আমরাও তা মেনে নিয়েছি। রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডাক্তারের সঙ্গে মমতাজের সম্পর্ক আছে এটা আমিও জানতাম। কিন্তু বিয়ে হয়েছে কিনা এটা স্পষ্ট করে বলতে পারব না। মমতাজ আর সেই ডাক্তারের যদি বিয়ে হয়েই যায়, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।
আফসোশ রমজান আলীর। তিনি এখনো মমতাজের দেওয়া কোনও ডিভোর্স লেটার আজও আমি পাইনি। রমজান আলী জানান, ১৯৯৯ সালে তিনি মমতাজকে বিয়ে করেন। বিয়ের দুই বছর পর ২০০১ সালের ৭ জানুয়ারি তাদের প্রথম কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। নাম রোহানী। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দ্বিতীয় কন্যা রৌজের জন্ম হয়।
মমতাজের ঘরের দুই সন্তানের সঙ্গে এখনও তার সম্পর্ক আছে। সাবেক মেয়র রমজানের বড় স্ত্রী আফরোজা বলেন, আমি প্রথম স্ত্রী হয়েও মমতাজ আর রমজানের বিয়ে মেনে নিয়েছিলাম। তার বাচ্চাদের দেখলে আমি নিজের মেয়েদের মতো আদর করি। এ জন্য ডিভোর্সের পক্ষে আমি ছিলাম না। মমতাজ যদি এটা করে থাকে, তাহলে ভুল করেছে। কারণ মমতাজ পার্লামেন্ট মেম্বার এবং রমজানও একজন জনপ্রতিনিধি। দুজনের সম্মানের দিকে তাকিয়ে এটা করা উচিত হয়নি।
কি উচিত আর কি উচিত হয়নি তা অনেক হোঁচট খেয়ে শিখছেন মমতাজ বেগম। শেখেননি রমজান আলী। রমজানও জনপ্রতিনিধি। তবে সাবেক এই জনপ্রতিনিধির ভোট এখন কমেছে। রমজানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে যে নারী সলতে জ্বেলে রেখেছিলেন তিনি এখন তার পাশে নেই।