মোঃ জয়নুল আবেদীন, আমতলী (বরগুনা): “মোরা এক সোমায় গাঙ্গের ধারে বইয়া ওই পাড়ের মানুর সাতে কতা কইতাম। এ্যাহোন হেই গাঙ্গ ভাইঙ্গ্যা বড় অইয়্যা গ্যাছে। এই গাঙ্গে মোগো ঘর-বাড়ী জায়গা জমি ভাইঙ্গ্যা গ্যাছে। মোরা জায়গা জমি খুঅ্যাইয়্যা গরিব অইয়্যা গেছি। মোগো ২০ একর জমি গাঙ্গে ভাইঙ্গ্যা গ্যাছে”। এ কথা বলেছেন তালতলীর মৌপাড়া গ্রামের ৯০ বছর বয়সি রফেজ উদ্দিন তালুকদার।
থামছে না পায়রা নদীর ভাঙন। নদীর ভাঙনে প্রতিদিনই আয়তনে ছোট হচ্ছে আমতলী ও তালতলী উপজেলা। নদী ভেঙে পূর্বের চেয়ে প্রস্থ তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৫ দিনে পায়রা নদীতে অর্ধশত একর জমি ও শতাধিক ঘর বাড়ী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফসলি জমি ও ঘর বাড়ী হারিয়ে পথে বসেছেন হাজারো পরিবার। ভয়াল পায়রা নদীর ভাঙনের হাত থেকে ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ী রক্ষায় দ্রুত ব্লক নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জানাগেছে, প্রমত্তা বুড়িশ্বর বা পায়রা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৯০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ছিল ১২০০ মিটার। বর্তমানে নদীটি ভেঙ্গে গড় প্রস্থ হয়েছে ৩৫০০ মিটার। নদী ভেঙ্গে পূর্বের চেয়ে প্রস্থ তিনগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে ভয়াল পায়রা নদী উত্তাল থাকে। জোয়ার ও ভাটার স্রোতে নদী ভেঙ্গে আকারে বড় হচ্ছে। গত ৫০ বছরে নদীর পাড়ের হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও হাজার হাজার পরিবারের ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভিটা মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ।
সম্প্রতি গত ১৫ দিনে আমতলী ও তালতলীর ৩০ কিলোমিটার পায়রা নদীর চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী, পৌর শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড, লোচা, আড়পাঙ্গাশিয়ার পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলী, পচাঁকোড়ালিয়া স্লুইজ, মৌপাড়া, গাবতলী, নকড়ী, তেতুঁলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙ্গার অর্ধশত একর ফসলি জমি ও শতাধিক ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। প্রতিদিনই এ সকল স্থান দিয়ে প্রবল স্রোতের চাপে নদীর পাড় ভাঙ্গছে। নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষায় এলাকাবাসী ব্লক নির্মাণ করার দাবী জানিয়েছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালীর ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে নদীর পাড়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ শতাধিক ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। আমতলী পৌর শহরের পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ফেরীঘাট পর্যন্ত ১২০০ মিটার, লোচা ৫০০ মিটার, পশুরবুনিয়া ১০০০ মিটার, বালিয়াতলী ২০০০ মিটার, মৌপাড়া ২০০০ মিটার, গাবতলী ৫০০ মিটার, তেতুঁলবাড়িয়া ১০০০ মিটার ও জয়ালভাঙ্গা ২০০০ মিটার পায়রা নদীর পাড় ভেঙ্গে ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ওই স্থানগুলোতে বসবাসরত পরিবারগুলো ভিটে মাটি ছেড়ে খুপরি ঘরে আশ্রয় নিয়েছে।
আবার অনেক পরিবার ভিটে মাটি হারিয়ে জন্মভুমি ছেড়ে কাজের সন্ধানে পরিবার পরিজন নিয়ে রাজধানী শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে অবস্থান নিয়েছে।
আমতলীর চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী গ্রামের রেজাউল করিম পান্না জানান, পায়রার ভাঙ্গনে বিদ্যালয়, ক্লিনিক, মাদ্রাসা ও মসজিদসহ শতাধিক ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। বাবার ভিটে মাটি নদীতে বিলিন হয়ে যাওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে আমতলী পৌর শহরে অবস্থান নিয়েছি।
আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী গ্রামের সাইদুর রহমান জানান, পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলীর প্রায় চার কিলোমিটার স্থান জুড়ে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ী পায়রা নদীতে ভেঙ্গে বিলিন হয়ে গেছে। দ্রুত এ এলাকায় ব্লক নির্মাণ করে নদীর ভাঙ্গন রোধ করা না হলে, এখানে বসবাসরত কয়েক শত পরিবার ভিটা মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে।
তালতলীর তেতুঁলবাড়িয়া গ্রামের আলমগীর হাওলাদার জানান, তেতুলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙ্গায় পায়রার ভাঙ্গন থামছেই না। প্রতিদিন ভেঙ্গে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ী নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে।
একই গ্রামের জসিম মিয়া জানান, বিকেলে জমিতে ফসল রোপন করে এসেছি। পরের দিন সকালে গিয়ে ওই স্থান আর খুঁজে পাচ্ছি না। দ্রুত ব্লক নির্মাণ করে পায়রার ভাঙ্গন রোধের দাবী জানাই।
আমতলী উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ সভাপতি আলহাজ্ব জিএম দেলওয়ার হোসেন বলেন, পায়রা নদীর ভাঙ্গনের হাত থেকে ফসলি জমি ও ঘর-বাড়ী রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে আরো ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পরবে আমতলী উপজেলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা আমতলী-তালতলীকে পায়রার কড়াল গ্রাস থেকে রক্ষায় দ্রুত ব্লক নির্মাণে দাবী জানাই।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ শাহ আলম বলেন, পায়রা ভাঙ্গন রোধে পশ্চিম ঘটখালী, আমতলী পৌরসভা, পশুরবুনিয়া, বালিয়াতলী, মৌপাড়া, জলায়ভাঙ্গা ও তেতুলবাড়িয়ার প্রায় ১০ কিলোমিটার পাড় নদী ভাঙ্গন রোধের চতুর্থ স্তরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান অফিসে তালিকা করে পাঠিয়েছি।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মশিউর রহমান বলেন, এ বছর পায়রার ভাঙ্গন রোধের কোন পরিকল্পনা নেই। আগামী অর্থ বছরে ব্লক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।