প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিএমএইচের বিছানায় শুয়ে থাকার দিনগুলো

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ : মেঘে মেঘে বয়স কম হল না! ভাবলাম থরো চেক আপ করিয়ে নেই। ইউরোলজি বিভাগে গেলাম। আলট্রাসনো করবার সাজেশন দিলেন কর্নেল শামীম ওয়াহেদ। কাগজ নিয়ে হাজির হলাম রেডিওলজিস্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জহিরের কাছে। ইউরিনারি ব্লাডারে পাথর। তখনই ইউরোলজি বিভাগে পাঠালেন।

কর্নেল শামীম ওয়াহেদ রিপোর্টএ চোখ রেখে বললেন, তুমি নিজেই ডাক্তার। সবই বোঝ। পাথর সরানো দরকার। স্পাইনাল এনেস্থিসিয়া লাগবে। ডিপার্টমেন্ট ঘুরে ঘুরে বুকের এস্করে, ইসিজি, হেমাটোলজিক্যাল প্রোফাইল করে এনেস্থিসিয়ার কর্নেল মাসুদের কাছে হাজির হলাম। নিজেই ওজন নিলেন, রিপোর্টএ চোখ বোলালেন। স্মিত হেসে জানালেন এটা একটি ছোট প্রক্রিয়া। নির্ভার করলেন উষ্ণ কণ্ঠে।

ভর্তি হলাম। ঠাঁই মিলল অফিসার্স ওয়ার্ড, রুম ৪১৯এ। রুমের আরেকটি নাম কীর্তনখোলা। আহা নদীর নামে নাম। ছবির মত সাজানো রুম। ঝকঝকে বিছানা। পরিস্কার টয়লেট, এক চিলতে বারান্দা। পরের দিন ওটি। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই একে একে এলো। এত মমতা, এত ভালবাসা। বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার প্রাণ। দশটার দিকে ওটিতে ডাক পড়ল। কনসালটেন্ট সার্জনের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। সাহস দেয়া কণ্ঠে নিরাপদ ওটির শুভ কামনা করলেন। পাশেই ছিলেন ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার শহীদ। তার মুখেও এক চিলতে মিষ্টি হাসি। পথে সন্মানিত ডিজিএম এস মহোদয়ের সামনে পরে গেলাম। স্মিত হাস্যে অগ্রজের স্নেহার্দ্য কণ্ঠে কুশল জানতে চাইলেন।

ওটিতে তুলতে তুলতে কর্নেল শামীম আস্থাভাজন কণ্ঠে, এটি সামান্য এন্ডোস্কপিক প্রসেজিওর মাত্র, বলে সাহস আরেক দফা বাড়ালেন। এনেস্থেসিয়ায় ছিলেন কর্নেল আসকার। তার রসবোধের সুনাম বিশ্বজোড়া। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে দরদভরা কণ্ঠে গাইলেন, বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে। আমিও সমস্বরে গেয়ে জানিয়ে দিলাম, জোছনা আমাকেও কথা দিয়েছে। মনিটরে সব ভেসে উঠছে। এটা ব্লাডার, এই যে সেই পাথর… ঘুম পাচ্ছে, বড্ড ঘুম পাচ্ছে।

জেগে দেখি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড। মনিটরে ভাইটাল প্যারামিটার সব ডিসপ্লে হচ্ছে। বার্তা এলো, সিএমএইচের কমান্ড্যান্ট আসছেন। এলেন। কুশল জানতে চাইলেন। কোথাও কোন অসুবিধে হচ্ছে কি না, ইঞ্চি ইঞ্চি করে তার খবরই শুধু নিলেন না, নিজে সরজমিনে যেন চেকলিস্ট মিলিয়ে নিলেন। রাতে টয়লেটে যাবার দরকার হল। মেডিকেল এসিট্যান্ট পরম মমতায় ধরে ধরে টয়লেটে নিয়ে গেলো। এনসিই আগেই সেটিকে ঝকঝকে করে রেখেছিল। নিরাপদে রাত পেরুলো। আবার ওয়ার্ড।

সকালের নাস্তায় চার টুকরো ব্রেড, জ্যাম, বাটার, ফল, কর্ন ফ্লেক্স। চা শরীরকে ঝরঝরে করে তুললো। আমার অধিনায়ক কার্টিয়াস অফিসার হিসেবে বিশেষ আদৃত। নানা মৌসুমি ফল দিয়ে বিশাল এক ফ্রুট বাস্কেট সাজিয়ে নিয়ে হাজির। কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান আসলেন। উনার হাতেও বিশাল ফ্রুট বাস্কেট। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে রোগীর পক্ষ হতে কোনই অভিযোগ নেই।

ক্যাথেটার একটু অসোস্তি এনেছিল। এটুকুকে মেনে নিতে হবে, সেটি মেজর আলম আরেকবার বুঝিয়ে দিল। ডিসচার্জ করা হল। ১১ সেপ্টেম্বর ভর্তি হয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ছাড়া পেলাম। মানুষ বড় বিচিত্র প্রাণী। হাসপাতালে সকল রোগীই কম বেশি ভয় পায়। অথচ হাসপাতাল ছেড়ে দিতে হবে ভেবে কি ক্ষণিকের তরে মন খারাপ হল? সিএমএইচের ইট-কাঠ-পাথরের মায়ায় কি পড়ে গেলাম?

এই পাঁচ দিনে একজন রোগী, সুইপার থেকে শুরু করে চিকিৎসক, এমন কি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে যেসব সেবা-যতœ আশা করে, আমি তার শতভাগই পেয়েছি। রোগী হিসেবে চিকিৎসক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই-একটা অভিযোগ থাকতেই পারে। ভুল না থাকলে, প্রত্যাশা পূরণ হলে আমি কিভাবে অভিযোগ জানাবো?

যাপিত জীবনে অস্তিত্বের প্রয়োজনে মূষিক দৌড়ে প্রায়ই ছুটতে হয়। ক্লান্ত লাগে। মাঝে মাঝে ভালবাসাহীনতা আর অনিশ্চয়তায় ভুগি। সিএমএইচ আমাকে ভালবাসা আর নিরাপত্তা দুইই দিয়েছিল। আচ্ছা, এমন কোন যায়গা কি নেই যেখানে সবসময়ই নিরাপত্তা আছে, ভালবাসা আছে?

লেখক : উপঅধিনায়ক, আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি/সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ